ডেইলি প্রেস ডেস্ক: ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উত্তেজনা ও ইতিহাসের জন্ম। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি ফাইনালের প্রতিটিই কোনো না কোনো কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। কোথাও জন্ম নিয়েছে নতুন কিংবদন্তি, কোথাও ঘটেছে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, আবার কোথাও টাইব্রেকারে নির্ধারিত হয়েছে বিশ্বসেরার মুকুট।
১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওর সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্বাগতিক উরুগুয়ে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যাচে প্রথমে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় উরুগুয়ে। হোসে নাসাজ্জির নেতৃত্বে উরুগুয়ের এই জয় বিশ্ব ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা করে। রানারআপ হয় আর্জেন্টিনা।
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালি অতিরিক্ত সময়ে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। রোমে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়া প্রথমে গোল করলেও ইতালি দ্রুত সমতা ফেরায় এবং অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিওর গোলে জয় নিশ্চিত করে। এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল, যা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। রানারআপ হয় চেকোস্লোভাকিয়া।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালি ৪-২ গোলে হাঙ্গেরিকে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সিলভিও পিওলা ফাইনালে দুটি গোল করেন এবং ইতালির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে এই আসর ইতিহাসে স্থান করে নেয়। রানারআপ হয় হাঙ্গেরি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে। প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ব্রাজিলের জন্য ড্রই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু আলসিদেস গিজ্জিয়ার জয়সূচক গোল পুরো ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেয়। এই ঘটনাকে ফুটবল ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে অভিহিত করা হয়। রানারআপ হয় ব্রাজিল।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত। শক্তিশালী হাঙ্গেরি ম্যাচের প্রথম আট মিনিটেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে ৩-২ গোলে জয় তুলে নেয়। হেলমুট রাহনের জয়সূচক গোল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। রানারআপ হয় হাঙ্গেরি।
সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল ৫-২ গোলে স্বাগতিক সুইডেনকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সী পেলে দুটি গোল করেন এবং বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক কিংবদন্তির জন্ম দেন। ফাইনালে তার করা ভলির গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। রানারআপ হয় সুইডেন।
চিলিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল ৩-১ গোলে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে। ইনজুরির কারণে পেলে বেশিরভাগ ম্যাচ খেলতে না পারলেও গারিঞ্চা ও আমারিলদো ব্রাজিলকে শিরোপা এনে দেন। রানারআপ হয় চেকোস্লোভাকিয়া।
ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে। জিওফ হার্স্টের করা বিতর্কিত গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তিনি ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। রানারআপ হয় পশ্চিম জার্মানি।
মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল ৪-১ গোলে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও ও কার্লোস আলবার্তোর সমন্বয়ে গড়া এই ব্রাজিল দলকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ফুটবল দল হিসেবে বিবেচনা করেন। কার্লোস আলবার্তোর করা চতুর্থ গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলীয় গোল। রানারআপ হয় ইতালি।
পশ্চিম জার্মানির মাটিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নেদারল্যান্ডস ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে যায়। কিন্তু ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ারের নেতৃত্বে পশ্চিম জার্মানি ২-১ গোলে জয় তুলে নেয়। জোহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবল দর্শন সেবার শিরোপা জিততে পারেনি। রানারআপ হয় নেদারল্যান্ডস।
স্বাগতিক আর্জেন্টিনা ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মারিও কেম্পেস দুটি গোল করেন। শেষ মুহূর্তে নেদারল্যান্ডসের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ম্যাচের ফল অন্যরকম হতে পারত। রানারআপ হয় নেদারল্যান্ডস।
স্পেনে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ইতালি ৩-১ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে। পাওলো রোসি পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলেন এবং গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জেতেন। রানারআপ হয় পশ্চিম জার্মানি।
মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জেতে। যদিও ম্যারাডোনা ফাইনালে গোল করেননি, তবে পুরো টুর্নামেন্টে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেয়। রানারআপ হয় পশ্চিম জার্মানি।
১৯৮৬ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয় পশ্চিম জার্মানি। আন্দ্রেয়াস ব্রেমের পেনাল্টি গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা জেতে তারা। এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। রানারআপ হয় আর্জেন্টিনা।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল ও ইতালি ১২০ মিনিটেও গোল করতে পারেনি। ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল টাইব্রেকারে গড়ায়। ইতালির রবার্তো বাজ্জিওর বিখ্যাত মিস করা পেনাল্টি ব্রাজিলকে চতুর্থ বিশ্বকাপ এনে দেয়। রানারআপ হয় ইতালি।
স্বাগতিক ফ্রান্স ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। জিনেদিন জিদান দুটি হেডে গোল করেন। ম্যাচের আগে ব্রাজিল তারকা রোনালদোর রহস্যজনক অসুস্থতা বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। রানারআপ হয় ব্রাজিল।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল ২-০ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ইনজুরি কাটিয়ে ফিরে আসা রোনালদো দুটি গোল করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। রানারআপ হয় জার্মানি।
জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ইতালি টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল জিনেদিন জিদানের মাথা দিয়ে মার্কো মাতেরাজ্জিকে আঘাত করা, যার ফলে তিনি লাল কার্ড দেখেন। এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত। রানারআপ হয় ফ্রান্স।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন অতিরিক্ত সময়ে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোল স্পেনকে ইতিহাস গড়ার সুযোগ এনে দেয়। রানারআপ হয় নেদারল্যান্ডস।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফাইনালে জার্মানি অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারায়। বদলি খেলোয়াড় মারিও গোটসের করা গোল জার্মানিকে চতুর্থ বিশ্বকাপ এনে দেয়। রানারআপ হয় আর্জেন্টিনা।
রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্স ৪-২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। কিলিয়ান এমবাপ্পে ফাইনালে গোল করে ইতিহাসের দ্বিতীয় কিশোর ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। রানারআপ হয় ক্রোয়েশিয়া।
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে অনেকেই ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে মনে করেন। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ৩-৩ গোলে সমতায় শেষ হয়। লিওনেল মেসি দুটি গোল করেন এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করেন। পরে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে মেসি নিজের ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেন। রানারআপ হয় ফ্রান্স।