1. admin@dailypressbd.com : ডেইলি প্রেস ডেস্ক :
গ্রামে শ্রমিক সংকট, শহরমুখী মানুষের স্রোতে চাপে গ্রামীণ অর্থনীতি - DAILY PRESS
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন

গ্রামে শ্রমিক সংকট, শহরমুখী মানুষের স্রোতে চাপে গ্রামীণ অর্থনীতি

  • সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে
rural urban life
প্রতীকী ছবি। গ্রাফিক্স: ডেইলি প্রেস

বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে দিন দিন শ্রমিক ও দিনমজুরের সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। কয়েক বছর আগেও ধান রোপণ, ফসল কাটা, ঘর নির্মাণ কিংবা অন্যান্য কৃষিকাজের জন্য সহজেই শ্রমিক পাওয়া যেত। এখন অনেক এলাকায় প্রয়োজনের সময় শ্রমিক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রামবাসী নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু গ্রামীণ জীবনেই প্রভাব ফেলছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

গ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে গিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, রিকশা চালাচ্ছেন, ফুটপাতে হকারি করছেন কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন। তুলনামূলকভাবে দৈনিক নগদ আয় এবং শহুরে জীবনের আকর্ষণ অনেককে গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে। ফলে গ্রামে কৃষিকাজ ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী কাজে শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

শ্রমিক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। ধান রোপণ, ধান কাটা, সবজি চাষ, সেচ, মাছের ঘের, ফলের বাগান কিংবা অন্যান্য মৌসুমি কৃষিকাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে অনেক কৃষক সময়মতো কাজ শেষ করতে পারছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে।

শুধু কৃষিই নয়, গ্রামে বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার, ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় একজন দক্ষ রাজমিস্ত্রি বা নির্মাণশ্রমিকের জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। এতে ব্যক্তিগত কাজের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও বিলম্বিত হচ্ছে।

অন্যদিকে শহরে এসে অনেক মানুষ যে কাজগুলো করছেন, তার একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। অটোরিকশা চালানো, ফুটপাতে হকারি করা বা অস্থায়ী ব্যবসা অনেকের জীবিকার মাধ্যম হলেও এসব খাতে অতিরিক্ত মানুষের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এতে আয়ও আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শহরের যানজট, ফুটপাত দখল, জনসমাগম এবং নগর ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, গ্রামে শ্রমিকের অভাব এবং শহরে অতিরিক্ত শ্রমশক্তির উপস্থিতি—দুই দিকেই ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উৎপাদনমুখী শ্রম। কৃষি, শিল্প ও নির্মাণ খাতে কর্মরত মানুষেরাই সরাসরি উৎপাদন বাড়ান। কিন্তু উৎপাদনশীল খাত থেকে শ্রমিক সরে গিয়ে যদি তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল বা অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বাজারে পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে হবে। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমে। একই সঙ্গে গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিভিত্তিক কারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে কর্মক্ষম মানুষ নিজ এলাকাতেই কাজের সুযোগ পাবেন।

গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা উন্নত করা গেলে শহরমুখী মানুষের প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং সহজ ঋণ সুবিধার মাধ্যমে তরুণদের স্থানীয়ভাবে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

তবে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি যে, সব মানুষ শুধু বেশি আয়ের আশায় শহরে যান না। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামে পর্যাপ্ত কাজের অভাব, মৌসুমি কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশাও মানুষকে শহরমুখী করে। তাই এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র মানুষকে গ্রামে থাকার আহ্বান জানিয়ে সম্ভব নয়; বরং গ্রামেই টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে কর্মসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা গেলে শ্রমিক সংকট কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে। পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামকে কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে শ্রমশক্তির সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে, যা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত খবর:

ফেসবুকে আমরা

Flag Counter
© 2026 Daily Press | KFAST Media | All Rights Reserved