তুর্য রহমান: ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ সাধারণত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা একদিকে ইসরাইলের নিরাপত্তার অধিকারকে সমর্থন করে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারও স্বীকার করে।
তবে এই সাধারণ অবস্থান থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম স্পেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের সরকার ফিলিস্তিনের মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক আইন এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে ইউরোপের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় স্পেনের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
স্পেন বহু বছর ধরেই দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের (Two-State Solution) পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। দেশটি মনে করে, স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ হলো স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বীকৃত সীমানার মধ্যে ইসরাইলের সহাবস্থান। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে বিপুল বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় কঠোর উদ্বেগ প্রকাশ করে। স্পেনের সরকার বারবার আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
২০২৪ সালের ২৮ মে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই দিনে আয়ারল্যান্ড ও নরওয়েও একই সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপকে ইউরোপীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়।
স্বীকৃতির সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়ভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নেওয়া হয়েছে। তার মতে, দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়ন ছাড়া সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
স্পেনের এই সিদ্ধান্তের পর ইসরাইল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং মাদ্রিদ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে পরামর্শের জন্য তেল আবিবে ফিরিয়ে নেয়। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে অনেকেই এখনও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশ বহু বছর আগে স্বীকৃতি দিয়েছিল। স্পেনের মতো পশ্চিম ইউরোপের একটি বড় অর্থনীতি ও প্রভাবশালী দেশ স্বীকৃতি দেওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
স্পেন শুধু স্বীকৃতি দিয়েই থেমে থাকেনি। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈঠকগুলোতেও গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধের কারণে কয়েক কোটি মানুষ মানবিক সংকটে পড়েছে। লক্ষাধিক ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল ও শরণার্থী শিবিরও ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্পেন ধারাবাহিকভাবে গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। দেশটি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNRWA-এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ সহায়তারও ঘোষণা দেয়, যখন কয়েকটি দেশ সংস্থাটির অর্থায়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। স্পেনের সরকার বলেছে, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা এবং যুদ্ধের মধ্যেও মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ব্যক্তিগতভাবেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি একাধিকবার গাজা সফরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে স্পেন এককভাবেও সেই সিদ্ধান্ত বিবেচনা করবে। পরবর্তীতে সেটিই বাস্তবে রূপ নেয়। সানচেজের সরকার মনে করে, কূটনৈতিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে শক্তিশালী করবে এবং শান্তি আলোচনায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের এই অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রতি স্পেনের জোরালো সমর্থন। দ্বিতীয়ত, স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বামপন্থী ও প্রগতিশীল দলগুলোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। তারা দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সমর্থন করে আসছে। তৃতীয়ত, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে স্পেন নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করে।
বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির মতো কয়েকটি বড় পশ্চিমা দেশ এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। স্পেনের সিদ্ধান্তের পর ইউরোপে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এর ফলে বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
স্পেনকে অনেক সময় ইউরোপের ব্যতিক্রমী কণ্ঠ বলা হলেও বাস্তবে দেশটি একা নয়। আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া এবং আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও ফিলিস্তিনের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। তবে স্পেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং প্রভাবশালী সদস্য হওয়ায় তার অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি গুরুত্ব পায়।
ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে স্পেনের অবস্থান মূলত আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মূল্যবোধ এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। দেশটি একদিকে হামাসের সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক সংকট নিয়েও ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে স্পেন ইউরোপীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিরাপত্তা নয়, ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ প্রতিনিধি।
তুর্য রহমান ১৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬টি সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।