তুর্য রহমান: রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। যদিও দেশের শাসনব্যবস্থা সংসদীয়, তবুও রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, সংবিধান রক্ষা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করেন, মৃত্যুবরণ করেন, অপসারিত হন বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কী ধরনের সাংবিধানিক ব্যবস্থা কার্যকর হবে- এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি চাইলে যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন। এ জন্য তাঁকে স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয়। স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়ে যায় এবং সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা কার্যকর হয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার জন্য সংসদের ভোট বা অন্য কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। সংবিধানে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পদত্যাগপত্র দাখিল করাই যথেষ্ট।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা রাষ্ট্রপতি অসুস্থতা, অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তবে স্পিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন না। তিনি কেবল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী (Acting President) হিসেবে কাজ করেন। এ সময় তিনি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পাদন করবেন। যদি কোনো কারণে স্পিকারও দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হন, তাহলে সংবিধানে নির্ধারিত পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদের সদস্যরা ভোট দেন। বাংলাদেশে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন না। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে শপথ নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে তিনি মূলত সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলেও সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
রাষ্ট্রপতি শুধু পদত্যাগই নয়, সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে অপসারিতও হতে পারেন। সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনতে হলে জাতীয় সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার কমপক্ষে এক-চতুর্থাংশ সদস্য লিখিত নোটিশ দেবেন। এরপর বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হবে। অভিযোগ তদন্ত ও আলোচনার পর সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হবেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিক রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন কারণে দায়িত্ব ছেড়েছেন। কেউ ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন, কেউ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে পদ হারিয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। পরে সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একইভাবে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়।
অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সরকারও হয়তো সংকটে পড়বে বা মন্ত্রিসভা ভেঙে যাবে। বাস্তবে বাংলাদেশের সংবিধানে এমন কোনো বিধান নেই। বাংলাদেশে নির্বাহী ক্ষমতা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলেও প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা, বিচার বিভাগ বা প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ হয় না। কেবল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বগুলো সাময়িকভাবে স্পিকার পালন করেন, যতক্ষণ না নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, মৃত্যু, অপসারণ বা সাময়িক অক্ষমতা- যে কারণেই পদ শূন্য হোক না কেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক শূন্যতা বা প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। এ ব্যবস্থাই বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
বিশেষ প্রতিনিধি।
তুর্য রহমান ১৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬টি সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।