রাহাত তুষার: মুসলমানের মৃত্যুর পর তার জন্য যে বিশেষ নামাজ আদায় করা হয়, সেটিই জানাজার নামাজ। এটি মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতের দোয়া। অনেকেই জানাজার নামাজে অংশ নিলেও সঠিক নিয়ম জানেন না। বিশেষ করে কোন তাকবিরে কী পড়তে হবে, কোন দোয়া পড়তে হবে কিংবা দোয়া না জানলে কী করবেন—এসব নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। তাই জেনে নেওয়া যাক জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম, প্রয়োজনীয় দোয়া, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ।
জানাজার নামাজে রুকু, সিজদা, তাশাহহুদ বা বৈঠক নেই। পুরো নামাজটি দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয়। ইমামের সঙ্গে চারটি তাকবির বলতে হয়। প্রতিটি তাকবিরের পর নির্ধারিত দোয়া পড়া সুন্নত।
নামাজ শুরু করার আগে মৃত ব্যক্তির জন্য জানাজার নামাজের নিয়ত করতে হবে। নিয়ত মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়। মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জানাজার নামাজ আদায়ের ইচ্ছা করলেই যথেষ্ট।
ইমাম প্রথম তাকবির “আল্লাহু আকবার” বলার পর মুসল্লিরাও তাকবির বলবেন এবং হাত বেঁধে নেবেন। এরপর সানা পড়া সুন্নত।
আরবি:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلٰهَ غَيْرُكَ
বাংলা উচ্চারণ:
সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র। সব প্রশংসা আপনারই। আপনার নাম বরকতময়। আপনার মর্যাদা সর্বোচ্চ। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
ইমাম দ্বিতীয়বার আল্লাহু আকবার বললে মুসল্লিরাও তাকবির বলবেন। এরপর দরুদে ইবরাহিম পড়বেন।
বাংলা উচ্চারণ (সংক্ষিপ্ত):
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ… কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম… ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ… কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম… ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যেমনটি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি করেছিলেন। তাঁদের প্রতি বরকত দান করুন, যেমনটি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পড়া হয়। বহুল প্রচলিত একটি দোয়া হলো—
আরবি:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়্যিনা, ওয়া মাইয়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা, ওয়া গাইবিনা, ওয়া সাগিরিনা, ওয়া কাবিরিনা, ওয়া যাকারিনা, ওয়া উনসানা।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী—সকলকে ক্ষমা করুন।
এরপর আরও দোয়া পড়া হয়—
اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফা আহইহি আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু আলাল ঈমান।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাকে জীবিত রাখবেন, তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন। আর যাকে মৃত্যু দেবেন, তাকে ঈমানের ওপর মৃত্যু দিন।
অনেকেই জানাজার দোয়া মুখস্থ জানেন না। এমন হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতের দোয়া করা যাবে। যেমন—
“হে আল্লাহ! এই মৃত ব্যক্তিকে ক্ষমা করুন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। তাঁর গুনাহ মাফ করুন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য দান করুন।”
চতুর্থ তাকবির বলার পর কিছুক্ষণ দোয়া করে ডান ও বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়। অধিকাংশ আলেমের মতে দুই সালাম দেওয়াই উত্তম।
অনেকেই জানাজার নামাজে দেরিতে এসে কী করবেন বুঝতে পারেন না। এমন হলে ইমামের সঙ্গে যে অবস্থায় পাবেন, সেখান থেকেই নামাজে শরিক হবেন। পরে সুযোগমতো বাকি তাকবিরগুলো পূরণ করবেন।
আবার কেউ কেউ জানাজার নামাজে রুকু বা সিজদা আছে বলে ভুল করেন। অথচ জানাজার নামাজে রুকু ও সিজদা নেই।
অনেকে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া না করে শুধু তাকবির বলে সালাম ফিরিয়ে দেন। অথচ জানাজার নামাজের মূল উদ্দেশ্যই হলো মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা।
জানাজার নামাজে যত বেশি মানুষ অংশ নেন, ততই মৃত ব্যক্তির জন্য তা কল্যাণকর বলে হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাই আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের জানাজায় অংশ নেওয়া মুসলমানের অন্যতম সামাজিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, জানাজার নামাজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি মৃত ব্যক্তির জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই দোয়াগুলো শুদ্ধভাবে শেখার চেষ্টা করা এবং অর্থ বুঝে পড়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য উপকারী।
নিজস্ব প্রতিবেদক। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাহাত তুষার ডেইলি প্রেসের সঙ্গে কাজ করছেন। এর আগে তিনি শুভ সকাল ডটকমে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তথ্য ও প্রযুক্তি খাতেও পারদর্শী তিনি।