মন রহমান: বাংলাদেশকে অনেকেই শুধু একটি ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক এলাকা, দ্রুত সম্প্রসারিত অবকাঠামো, রপ্তানিমুখী শিল্প, তরুণ জনশক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশকে এখন বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতির একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) আকার প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৯৭ ডলার। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এত বড় জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও বেকারত্বের হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তুলনামূলক কম, প্রায় ৩.৮ শতাংশ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে ভারত, পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার এবং উত্তরেও ভারত। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল বাজারের মাঝখানে অবস্থান করছে দেশটি। একই সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হওয়ার সুযোগও বাংলাদেশের রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অবস্থানকে পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ শুধু একটি উৎপাদনকেন্দ্র নয়, বরং আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সম্পদ বঙ্গোপসাগর। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহারের অধিকার পেয়েছে। এই সমুদ্র এলাকায় মৎস্যসম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, সামুদ্রিক খনিজ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ব্লু ইকোনমির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপানসহ শতাধিক দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়। লাখো মানুষের কর্মসংস্থানও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ফিরেছে, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি প্রধান ভিত্তি। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত কোটি বাংলাদেশি প্রতি বছর দেশে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত রেমিট্যান্স দেশের জিডিপির প্রায় ৬.১ শতাংশের সমান। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভোগব্যয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হলো জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend)। দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের। এই জনগোষ্ঠীকে যদি আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে আগামী দুই দশকে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ এবং বে টার্মিনাল প্রকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণাধীন চট্টগ্রাম বে টার্মিনাল ভবিষ্যতে দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরিচালনা করতে পারবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় ও জাহাজের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থাও বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিবিআইএন (BBIN), বিমসটেক (BIMSTEC) এবং ভারত-নেপাল-ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে লজিস্টিক ও পরিবহন খাত থেকেই ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের পথে রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতার স্বীকৃতি। তবে একই সঙ্গে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার কিছু অংশ হারানোর চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে। তাই এখন থেকেই রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সবকিছুই যে ইতিবাচক, তা নয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) উভয়ই বলছে, বাংলাদেশকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম কর-জিডিপি অনুপাত, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রাজস্ব বাড়ানো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলেছে, সময়োপযোগী অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সবুজ জ্বালানি, ডিজিটাল সেবা, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন এবং উদ্ভাবনই হবে নতুন অর্থনীতির ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদে বড় বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সুযোগ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়ায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে বৈশ্বিক সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা যেমন বিশাল, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রসম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী, রপ্তানিমুখী শিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ—এসবই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে কেবল সম্ভাবনা নয়, প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভৌগোলিক অবস্থান; আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
বিশেষ প্রতিনিধি।
মন রহমান দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছেন। এখন পর্যন্ত ৭টি মিডিয়া হাউজে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।