তুর্য রহমান: করবর্ষ শুরু হলেই আয়কর রিটার্ন নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ে লাখো করদাতার। তবে এবার আগের তুলনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা আরও সহজ করেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে কর রেয়াতের সুযোগও রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সময়মতো রিটার্ন না দিলে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হতে পারে। তাই শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা এবং নিয়ম জেনে রিটার্ন জমা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কর বিশেষজ্ঞরা। এনবিআর ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য ই-রিটার্ন কার্যক্রম চালু করেছে এবং করদাতাদের অনলাইন সেবার প্রতি আরও বেশি উৎসাহিত করছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়কর রিটার্ন শুধু কর পরিশোধের বিষয় নয়। এটি একজন নাগরিকের আর্থিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বর্তমানে ব্যাংক ঋণ, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণের ভিসা, সরকারি বিভিন্ন সেবা এবং নানা আর্থিক লেনদেনে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। ফলে যাদের জন্য রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
এবারের করবর্ষে আগেভাগে রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। এনবিআরের ঘোষণা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের শুরুতেই অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করলে নীট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়া যাবে। তবে এই রেয়াতের একটি সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে করদাতাদের শেষ সময়ের ভিড় কমিয়ে ধীরে ধীরে সারা বছরজুড়ে রিটার্ন দাখিলের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
বর্তমানে অধিকাংশ ব্যক্তি করদাতার জন্য ই-রিটার্নই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঘরে বসেই কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ব্যবহার করে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব। এতে কর অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। একই সঙ্গে অনলাইনে কর পরিশোধ, রিটার্ন জমা এবং স্বীকৃতিপত্র ডাউনলোড করার সুবিধাও পাওয়া যায়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ই-রিটার্ন চালুর পর থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ করবর্ষে প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে প্রথমে এনবিআরের ই-ট্যাক্স পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করতে হবে। যাদের আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তারা টিআইএন নম্বর, পাসওয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে লগইন করতে পারবেন। নতুন করদাতাদের আগে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নিবন্ধনের সময় টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
লগইন করার পর করদাতার ব্যক্তিগত তথ্য, আয়ের উৎস, বেতন, ব্যবসা বা পেশাগত আয়, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, এফডিআর, বাড়িভাড়া, অন্যান্য আয় এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ও দায়ের বিবরণ যুক্ত করতে হবে। কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে পরবর্তী সময়ে আবার লগইন করে তা সংশোধন করা যায়। সব তথ্য যাচাই শেষে প্রযোজ্য কর থাকলে অনলাইনেই কর পরিশোধ করা যাবে। সবশেষে রিটার্ন জমা দিয়ে স্বীকৃতিপত্র (Acknowledgement Receipt) ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে হবে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রয়োজনে এই কপিটি কাজে লাগতে পারে।
রিটার্ন পূরণের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেতনভোগীদের ক্ষেত্রে বেতন সনদ, উৎসে কর কর্তনের সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিনিয়োগের কাগজপত্র এবং সঞ্চয়পত্রের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসার নথিপত্র এবং অন্যান্য আর্থিক দলিল প্রস্তুত রাখতে হয়। এছাড়া সম্পদ ও দায়-সংক্রান্ত তথ্যও সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হয়। ভুল তথ্য দিলে পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।
অনেক করদাতা প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দিতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে আয়ের একাধিক উৎস থাকলে, সম্পদের হিসাব জটিল হলে কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেন বেশি থাকলে রিটার্ন পূরণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। করদাতারা চাইলে নিবন্ধিত ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার (আইটিপি), চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কর আইনজীবী অথবা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিতে পারেন। তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে আইন অনুযায়ী রিটার্ন প্রস্তুত করে দেন। তবে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দিলেও তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত করদাতার নিজের ওপরই থাকে। তাই জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কর বিশেষজ্ঞরা।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই মনে করেন আয়কর রিটার্ন মানেই কর দিতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। অনেকের করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। আবার কারও করযোগ্য আয় থাকলেও বিভিন্ন বিনিয়োগ, করমুক্ত আয় বা আইনসম্মত কর রেয়াতের কারণে প্রদেয় কর কমে যেতে পারে। তাই আয়কর রিটার্নকে শুধু কর পরিশোধের বিষয় হিসেবে না দেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলে করদাতাদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এনবিআরের ঘোষণা অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে নীট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ কর রেয়াত পাওয়া যাবে। তবে এই রেয়াতের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কোনো প্রণোদনা বা জরিমানা থাকবে না। তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। তাই কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই রিটার্ন জমা দেওয়া সবচেয়ে লাভজনক। এতে যেমন কর রেয়াত পাওয়া যায়, তেমনি অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকিও থাকে না।
রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে কয়েকটি কাগজপত্র হাতের কাছে রাখলে পুরো প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে টিআইএন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, বেতন সনদ, উৎসে কর কর্তনের সনদ, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের তথ্য, শেয়ার বা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কাগজপত্র, বাড়ি বা জমির দলিল, ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং প্রয়োজন হলে ঋণ বা দায়-সংক্রান্ত তথ্য। এসব তথ্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকলে অনলাইনে রিটার্ন পূরণ করতে খুব বেশি সময় লাগে না।
এনবিআর করদাতাদের ই-রিটার্ন ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ঘরে বসেই কম্পিউটার, ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব। অনলাইনে কর পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে ব্যাংক বা কর অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না। রিটার্ন জমা দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতিপত্রও ডাউনলোড করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে শুরুতেই রিটার্ন জমা দেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। এতে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে, সার্ভারের চাপও কম থাকে এবং আগেভাগে রিটার্ন দাখিলের জন্য সরকার ঘোষিত কর রেয়াতের সুবিধাও পাওয়া যায়। সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করলে ভবিষ্যতে করসংক্রান্ত কোনো জটিলতায় পড়ার আশঙ্কাও অনেকটাই কমে যায়।
বিশেষ প্রতিনিধি।
তুর্য রহমান ১৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬টি সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।