আল জাজিরা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যুদ্ধাবস্থা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বিমার (War Risk Insurance) প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানির দাম, পণ্যের মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ওমান উপকূলের দক্ষিণ দিক দিয়ে চলাচলের সময় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তাতে আগুন ধরে যায়। একই সময়ে আরও দুটি জাহাজ ফিরে যায়।
আইআরজিসির অভিযোগ, জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে চলাচল করছিল এবং তারা মাইন পাতা পথ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকবে এবং কোনো তেলবাহী জাহাজ সেখানে প্রবেশ বা বের হতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করত। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হতো।
সংঘাত তীব্র হওয়ার সময় একপর্যায়ে প্রতিদিন মাত্র দুটি ট্যাংকার এই প্রণালি অতিক্রম করে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও চলাচল এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে পারেনি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগে একটি জাহাজের বিমা খরচ জাহাজের মূল্যের ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনে ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল বহনের বিমা ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি মেট্রিক টনে ৭৭ দশমিক ৯৬ ডলার। পাঁচ বছরের গড় ব্যয় ছিল মাত্র ১৮ দশমিক ৯১ ডলার। অর্থাৎ বর্তমান খরচ গড়ের তুলনায় চার গুণেরও বেশি। এই হিসাবে একটি বড় তেলবাহী জাহাজের বিমা ব্যয় প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সম্প্রতি সৌদি আরবের বন্দর ও জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। তারা দাবি করেছে, সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ অন্তত একটি জাহাজে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই ঘটনার পর বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমে গেছে। একদিনের ব্যবধানে সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাব আল-মান্দেবে বিমার খরচও বেড়েছে। তবে তা এখনো হরমুজ প্রণালির তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিমা ব্যয় জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে পশ্চিম সৌদি আরব উপকূলের তুলনামূলক নিরাপদ অংশে এই হার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।
সামুদ্রিক পরিবহন বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেনের মতে, কেবল বিমার খরচই নয়, জাহাজমালিকরা তাদের নাবিকদের নিরাপত্তা এবং জাহাজে হামলার ঝুঁকিকেও বেশি গুরুত্ব দেন। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ রুট এড়িয়ে যেতে পারে।
লন্ডনের বেইস বিজনেস স্কুলের বীমা বিশেষজ্ঞ সিমোন ক্রুমমাকার বলেন, অনেক রুটে এখনো বিমা পাওয়া গেলেও তা কঠোর শর্তে এবং অনেক বেশি খরচে দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্যিকভাবে সেই পথে চলাচল লাভজনক নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে জাহাজের সংখ্যা কমে গেলে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হবে। এতে যাত্রার সময় বাড়বে, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হবে। পাশাপাশি তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।