তুর্য রহমান: একটি গোল। ১২০ মিনিটের লড়াই। আর সেই এক মুহূর্তই বদলে দিল বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস। টানা আক্রমণ, দারুণ কৌশল, অসাধারণ ধৈর্য এবং নিখুঁত দলগত ফুটবলের প্রদর্শনী শেষে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। ২০১০ সালের পর আবারও ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে বিশ্বসেরার মুকুট পরল লা রোহা। অন্যদিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল লিওনেল মেসিদের।
স্কোরলাইন বলছে ম্যাচে মাত্র একটি গোল হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের পরিকল্পনা, মাঝমাঠের আধিপত্য এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা—প্রায় সব বিভাগেই এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনা লড়েছে সাহস নিয়ে। কিন্তু পুরো ম্যাচে তারা খুব কম সময়ই নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে পেরেছে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ না করলে নির্ধারিত সময়েই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে যেতে পারত।
ফাইনালের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুই প্রজন্মের দুই প্রতীক। একদিকে লিওনেল মেসি। অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচ কোনো একক তারকার ছিল না। এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ দলের জয়। লুইস দে লা ফুয়েন্তের গড়া স্পেন পুরো টুর্নামেন্টের মতো ফাইনালেও দেখিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে ব্যক্তিনির্ভরতার চেয়ে সংগঠিত দলগত কাঠামোই সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রথম বাঁশি থেকেই নিজেদের পরিচিত ছন্দে খেলতে শুরু করে স্পেন। রদ্রি মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো বারবার বলের দখল ধরে রেখে আর্জেন্টিনাকে রক্ষণে ঠেলে দেন। দুই উইং দিয়ে লামিন ইয়ামাল ও অ্যালেক্স বায়েনা আক্রমণের গতি বাড়ান। অপরদিকে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই অপেক্ষা করছিল দ্রুত পাল্টা আক্রমণের। কিন্তু স্পেনের হাই প্রেসিং সেই পরিকল্পনাকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়।
প্রথমার্ধেই কয়েকটি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করে স্পেন। তবে প্রতিবারই আর্জেন্টিনাকে বাঁচান গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। কখনো পা বাড়িয়ে, কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে, আবার কখনো দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে তিনি গোল ঠেকান। একসময় মনে হচ্ছিল, একাই যেন পুরো স্প্যানিশ আক্রমণের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে লিওনেল মেসিকে ঘিরে স্পেনের পরিকল্পনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বল পেলেই দুই বা তিনজন খেলোয়াড় তাকে ঘিরে ফেলেছেন। ফলে তিনি খুব কম সময়ই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মাঝমাঠে রদ্রি এবং স্পেনের রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল উৎসগুলোকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য শেষ হলেও ম্যাচের গতি এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি। অতিরিক্ত সময়ের আগে এঞ্জো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনে নেমে আসে। সেই মুহূর্ত থেকেই ম্যাচ পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
অবশেষে ১০৬তম মিনিট। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। স্পেনের ধারাবাহিক আক্রমণের এক পর্যায়ে ফেরান তোরেস সুযোগ পেয়ে জালে বল জড়িয়ে দেন। পুরো স্টেডিয়াম তখন স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে কেঁপে ওঠে। সেটিই ছিল ম্যাচের একমাত্র গোল। আর সেই গোলেই স্পেন ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম নতুন করে লিখে ফেলে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর উচ্ছ্বাস লুকাতে পারেননি স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এই দল ইতিহাস গড়েছে। খেলোয়াড়রা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিশ্বাস ধরে রেখেছে। আমরা কখনো আমাদের ফুটবল দর্শন থেকে সরে যাইনি। এই বিশ্বকাপ তাদের কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং ঐক্যের পুরস্কার।” তিনি আরও বলেন, “ইউরো জয়ের পর বিশ্বকাপ জয় প্রমাণ করে, এই প্রজন্ম স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষ একটি জায়গা করে নিয়েছে।”
ফাইনালের একমাত্র গোল করে নায়ক বনে যাওয়া ফেরান তোরেস বলেন, “এটি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটি যেন আমাদের জন্যই লেখা ছিল। এই গোল শুধু আমার নয়, পুরো স্পেনের মানুষের। আমরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস হারাইনি, আর সেই বিশ্বাসই আমাদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছে।”
পুরো টুর্নামেন্টে মাঝমাঠে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখানো রদ্রি দলগত ঐক্যকেই সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই শিরোপা কোনো একজন খেলোয়াড়ের নয়। এটি পুরো দলের অর্জন। আমরা শুরু থেকেই একে অপরের জন্য লড়েছি। আমাদের ঐক্যই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।”
অন্যদিকে পরাজয় মেনে নিয়ে প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানান আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, “স্পেন আজ আমাদের চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছে। তারা এই শিরোপার যোগ্য। তবে আমার খেলোয়াড়দের নিয়েও আমি গর্বিত। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ফুটবলে জয়-পরাজয় থাকবেই। আজ আমাদের পরাজয় মেনে নিতে হবে।”
হতাশ লিওনেল মেসি বলেন, “আমরা শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেটা পূরণ হলো না। তবু আমি আমার সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমাদের সমর্থকদের ধন্যবাদ জানাই। তারা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আমাদের পাশে ছিলেন।”
ফাইনালে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করেও দলকে শিরোপা এনে দিতে না পারা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বলেন, “আমরা সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। অনেকক্ষণ ম্যাচে টিকে ছিলাম। কিন্তু ফুটবলে কখনো কখনো একটি মুহূর্তই সবকিছু বদলে দেয়। এই হার খুব কষ্টের, তবে আমরা মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়ছি।”
বিশেষ প্রতিনিধি।
তুর্য রহমান ১৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬টি সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।