তুর্য রহমান: বিশাল যুদ্ধজাহাজ। পরমাণু শক্তিচালিত। সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার সদস্যের বিশাল বহর। আকাশে যুদ্ধবিমান ওঠানামা করে। সমুদ্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। কিন্তু থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে ঢোকার পর সেই যুদ্ধজাহাজের গায়ে চোখ আটকে গেছে অনেকের।
হালের বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট মরিচার দাগ। কোথাও বড় বাদামি-কমলা ছোপ। পানির কাছাকাছি অংশেও দেখা যাচ্ছে জমাট দাগ ও সামুদ্রিক আস্তরণের চিহ্ন। উড়োজাহাজ ওঠানামার জায়গার কিনারাতেও দেখা গেছে মরিচার দাগ। ছবিগুলো প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের এমন চেহারা কেন? এটি কি শুধু রং উঠে যাওয়ার ঘটনা, নাকি এর পেছনে আরও বড় ক্ষয়ের আশঙ্কা আছে? প্রকাশ্য তথ্য বলছে, বিষয়টি হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, লবণাক্ত পানির ক্ষয় এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সীমিত সুযোগ।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছায়। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই মোতায়েনে জাহাজটি ২৮৬ দিন সমুদ্রে ছিল। থাইল্যান্ডে পৌঁছানো ছিল মোতায়েন শুরুর পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বন্দর-সফর।
এই সময়ের প্রায় সাত মাস জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সামরিক কার্যক্রমে ছিল। যুদ্ধ অভিযানেও অংশ নিয়েছে জাহাজটির বহর। অর্থাৎ এটি দীর্ঘ সময় ধরে শুধু সমুদ্রে ভেসে থাকেনি। উচ্চমাত্রার সামরিক দায়িত্বও পালন করেছে।
এই দীর্ঘ সময়ের একটি সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জাহাজের বাইরের অংশে। কারণ যুদ্ধজাহাজের বাইরের ধাতব অংশ সবসময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি, আর্দ্রতা ও বাতাসের সংস্পর্শে থাকে। নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত রং ঠিক করা না হলে ধাতুর ওপর ক্ষয়ের প্রক্রিয়া বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক ছবিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে, সেটিই হলো এই ক্ষয়ের দৃশ্যমান চিহ্ন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাংবাদিকেরা জাহাজটিকে বন্দরে ঢোকার সময় কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হালের বিশেষ করে পানির ঠিক ওপরে এবং উড়োজাহাজ ওঠানামার জায়গার কিনারায় বড় বড় মরিচার দাগ দেখা গেছে।
অর্থাৎ ছবিতে দেখা মরিচা কোনো কল্পিত বিষয় নয়। এটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করা এবং সংবাদমাধ্যমে নথিবদ্ধ হওয়া দৃশ্য। মরিচা শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয় এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি যুদ্ধজাহাজের গায়ে মরিচা দেখা গেলেই সেটি বিপজ্জনক অবস্থায় চলে গেছে—এমনটা বলা যায় না। কিন্তু মরিচাকে একেবারে তুচ্ছ করাও ঠিক নয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশিকায় ক্ষয় নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জাহাজের আবরণ বা সুরক্ষামূলক প্রলেপ ঠিক রাখা জরুরি। কারণ এই ব্যবস্থা ধাতব কাঠামোকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে একই নির্দেশিকায়।
সেখানে বলা হয়েছে, জাহাজের সুরক্ষামূলক আবরণে সমস্যা শনাক্ত করে সময়মতো মেরামত না করলে আবরণ নষ্ট হতে পারে। পরে ধাতব কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে মেরামতের খরচ বাড়ে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে জাহাজের সমুদ্রে চলাচলের সক্ষমতা ও যুদ্ধক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ আজকের মরিচা মানেই আজকের বিপদ নয়। কিন্তু ভবিষ্যতের বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। এ কারণেই মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে মরিচা ও ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে আলাদা ব্যবস্থা রাখে। নৌবাহিনীর আরেকটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, জাহাজের ক্ষয় শনাক্ত করতে মরিচার দাগ, ধাতুর ক্ষয়, আবরণ উঠে যাওয়া এবং অন্যান্য লক্ষণ খেয়াল রাখতে হয়।
ছবিতে যে জায়গাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো পানির কাছাকাছি হালের অংশ। এর কারণও সহজ। এই অংশটি নিয়মিত লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকে। কখনো পানির নিচে থাকে। কখনো পানির ওপরে উঠে আসে। একই সঙ্গে লবণ, পানি ও বাতাসের প্রভাব পড়ে। এ ধরনের পরিবেশ ধাতুর ক্ষয়ের জন্য খুবই অনুকূল। মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই জানিয়েছে, মরিচা তাদের জন্য প্রতিদিনের একটি বড় রক্ষণাবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ। নৌবাহিনীর প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ক্ষয়প্রাপ্ত ধাতু মেরামত, নষ্ট আবরণ সরানো এবং জাহাজের অংশ পুনরায় সুরক্ষিত করতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
আর জাহাজটি যত বেশি সময় সমুদ্রে থাকবে, বাইরের অংশের ওপর তত বেশি পরিবেশগত চাপ পড়বে। তাই ২৮৬ দিনের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর হালে মরিচার দাগ দেখা যাওয়ার পেছনে সামুদ্রিক পরিবেশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখনই বলা যাচ্ছে না যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মূল কাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। ছবিতে মরিচা দেখা গেছে। আবরণে ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা গেছে। কিন্তু ছবির মাধ্যমে ধাতুর ভেতরের অবস্থা জানা যায় না। কোথাও শুধু ওপরের আবরণে মরিচার দাগ থাকতে পারে। কোথাও আরও গভীর ক্ষয় হতে পারে। সেটি জানতে হলে সরেজমিন পরীক্ষা প্রয়োজন।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক একটি প্রকৌশলবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো জাহাজে কাঠামোগত ক্ষয় বা মরিচা পাওয়া গেলে প্রকৌশলীদের পরীক্ষা করে দেখতে হয় জাহাজটি মেরামতের আগ পর্যন্ত নিরাপদে চলতে পারবে কি না। তাই শুধু ছবির ভিত্তিতে আব্রাহাম লিংকনকে অচল বা যুদ্ধের অযোগ্য বলা যাবে না। বরং ছবিগুলো যে বিষয়টি স্পষ্ট করছে, তা হলো—জাহাজটির বাইরের অংশে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ জমেছে। আর সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এর উত্তরও পাওয়া যায় জাহাজটির সাম্প্রতিক যাত্রাপথে। সাধারণ পরিস্থিতিতে বিমানবাহী রণতরীগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরপর বন্দরে নেওয়া হয়। সেখানে নাবিকদের বিশ্রাম দেওয়া হয়। রসদ নেওয়া হয়। পাশাপাশি জাহাজের বিভিন্ন অংশে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের এবারের যাত্রা ছিল ব্যতিক্রমী দীর্ঘ। মার্কিন নৌবাহিনী বলছে, থাইল্যান্ডের সফরটি ছিল মোতায়েন শুরুর পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বন্দর-সফর। অর্থাৎ প্রায় নয় মাসের এই দীর্ঘ দায়িত্বের পর প্রথমবার বড় ধরনের বন্দর-বিরতি পেয়েছে জাহাজটি।
এই দীর্ঘ সময়ের কারণেই বাইরের অংশের নিয়মিত রং করা, পরিষ্কার করা ও ক্ষয়রোধের কাজ পিছিয়ে থাকতে পারে। মজার বিষয় হলো, মার্কিন নৌবাহিনীর নিজস্ব নথিতেই সমুদ্রে থাকা অবস্থায় মরিচা নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমিত পরিসরে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সব ধরনের বড় রক্ষণাবেক্ষণ সমুদ্রের মধ্যেই করা সম্ভব নয়।
হ্যাঁ, তবে সেটি সতর্কবার্তা, সরাসরি বিপদের প্রমাণ নয়। কারণ মার্কিন নৌবাহিনীর নিজের নিয়মই বলছে, ক্ষয় শুরু হলে সেটি পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো মেরামত করা জরুরি। একটি ছোট আবরণগত সমস্যা সময়ের সঙ্গে বড় ক্ষয়ে পরিণত হতে পারে। আর আব্রাহাম লিংকনের ছবিতে যে মরিচার দাগ দেখা গেছে, সেগুলো সেই রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে। জাহাজটির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন ড্যান কিলার অবশ্য বলেছেন, দীর্ঘ সময়ের মোতায়েনের পর এমন চেহারা স্বাভাবিক। এ বিষয়ে তিনি আর মন্তব্য করতে চাননি।
আব্রাহাম লিংকন ভেঙে পড়েনি। কিন্তু দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার চিহ্ন তার গায়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মরিচা তার যুদ্ধক্ষমতা নষ্ট হওয়ার প্রমাণ নয়। তবে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, এত বড় যুদ্ধজাহাজকেও সমুদ্রের লবণাক্ত পরিবেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। আর সময়মতো সেই ক্ষয় পরিষ্কার ও মেরামত না করলে আজকের বাদামি দাগই একদিন আরও গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। সুতরাং থাইল্যান্ডের বন্দরে আব্রাহাম লিংকনের মরিচাধরা চেহারা শুধু একটি পুরোনো জাহাজের ছবি নয়। এটি প্রায় নয় মাসের টানা সমুদ্রযাত্রা, যুদ্ধের চাপ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কঠিন বাস্তবতারও একটি দৃশ্যমান ছবি।
বিশেষ প্রতিনিধি।
তুর্য রহমান ১৪ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। এখন পর্যন্ত ৬টি সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।