বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও বিপজ্জনক সামাজিক ব্যাধিগুলোর একটি হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনেও এই ব্যাধি নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলছে। উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে, এবং একটি বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলাম দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী।
ইসলাম দুর্নীতিকে শুধু একটি সামাজিক বা প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কুরআনে বহু আয়াতে এবং হাদীসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং বিচারকের কাছে তা পৌঁছানোর জন্য ঘুষ দিও না, যাতে তোমরা অন্যের সম্পদ জেনে-বুঝে অন্যায়ভাবে ভোগ করতে পারো।”
— (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে যে, ঘুষ ও প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের অধিকার দখল করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম চায়, সমাজে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হোক।
রাসূলুল্লাহ (সা.) দুর্নীতির বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।
তিনি বলেছেন:
“ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।”
— (তিরমিজি: ১৩৩৭)
এমনকি এক সাহাবী যখন উপহার নামে কিছু গ্রহণ করেছিলেন, রাসূল (সা.) তাঁকে তিরস্কার করে বলেন, “তুমি যদি বাড়িতে বসে থাকতে, এসব উপহার কীভাবে পেতে?” এ থেকে বোঝা যায়, দায়িত্বে থাকাকালীন ব্যক্তির কোনো অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করাও ইসলামে দুর্নীতির মধ্যে পড়ে।
ইসলাম দুর্নীতিকে নির্মূল করার জন্য কেবল শাস্তির ভয় দেখায়নি, বরং একটি মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য নৈতিক চরিত্র ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছে। আমানতদারি, ইনসাফ, জবাবদিহিতা এবং তাকওয়া—এই চারটি মূল ভিত্তির ওপর ইসলাম দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে চায়।
একজন মুমিন ব্যক্তি সবসময় জানেন, আল্লাহ তাকে দেখছেন। তাই তিনি প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে, কোনো অন্যায় করতে ভয় পান।
কুরআনে বলা হয়েছে,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন যে, তোমরা আমানত তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও যারা এর উপযুক্ত।”
— (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
ইসলাম সবসময় ন্যায়ের ওপর দাঁড়াতে বলে—even যদি তা নিজের বিরুদ্ধে হয়। এই শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
ইতিহাসে দেখা যায়, খলিফা উমর (রা.) তাঁর সন্তানদের ওপরও সম্পদের হিসাব দিতেন, যাতে কারো বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ইসলামি স্কলার ও ইমামগণ বিভিন্ন সময় জুমার খুতবা এবং ইসলামি সম্মেলনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে থাকেন।
শায়খ মুফতি কাজী হারুনুর রশিদ বলেন, “দুর্নীতি শুধুমাত্র আইনের ব্যর্থতা নয়, এটি আত্মিক দুর্বলতার প্রতিফলন। ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কল্পনাও করা যায় না।”
আজকের বাংলাদেশে যখন দুর্নীতি জাতীয় উন্নয়নের বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, তখন ইসলামের এই শিক্ষা জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, স্কুল, মাদ্রাসা, অফিস—সবখানেই যদি ধর্মীয় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা শেখানো হয়, তবে দুর্নীতিকে সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।
ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়—এটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান কেবল নৈতিক নয়, বরং একটি কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক রূপরেখাও প্রদান করে। এ শিক্ষা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব।