ডেইলি প্রেস ডেস্ক: আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার বেশ কিছু কঠোর ও সময়োপযোগী নিরাপত্তামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে ‘রাতের ভোট’ বিতর্ক থেকে বের হয়ে আসতে এবার ভোটগ্রহণের দিন সকালেই ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হবে। তবে এসব সামগ্রী আগের দিনই জেলা, উপজেলা ও বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, ভোটের দিন সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বডিওর্ন ক্যামেরা পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গত ৯ জুলাই যমুনায় অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সংস্কার বিষয়ক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ব্যালট আগেভাগে কেন্দ্রে পৌঁছানোকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছিল। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ভোটের দিন সকালেই ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে ১৫ দিন নির্দিষ্ট রুট ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের যানবাহন যেমন ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, পিকআপ, ট্রাক, লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। একইসঙ্গে নির্বাচনী এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচলেও সাতদিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে ১৯ হাজার ২৯২ জন সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। এই নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে ডিসি, এসপি, ইউএনও ও ওসিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে বদলির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইসিকে লটারিভিত্তিক বদলি পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশে ১১ হাজার, বিজিবিতে ৫ হাজার ৫১৩, কোস্টগার্ডে ৬৩৪ ও আনসারে ২ হাজার ১৪৫ জন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই প্রস্তুতি ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচনী প্রস্তুতি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে গত ৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং অপ্রত্যাশিত খরচের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকার নির্বাচন উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেবে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার পুলিশ সদস্য, ৪৭ হাজার অঙ্গীভূত ও সশস্ত্র আনসার, ৪৭ হাজার লাঠিসহ আনসার-ভিডিপি এবং ৯৪ হাজার গ্রাম পুলিশ ও দফাদার থাকবেন। একইসঙ্গে নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ৬০ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব।
নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রতিটি রিটার্নিং অফিসার নিজ এলাকায় একটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সেল গঠন করবেন। পুলিশ সুপার বা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্ট্রাইকিং ফোর্স ও অন্যান্য বাহিনীর মোতায়েনের পরিকল্পনা করবেন। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকেও ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’ অনুযায়ী কাজে লাগানো হবে।
নির্বাচনে অনিয়ম রোধে দায়িত্বরতদের জন্য নির্দেশিকা তৈরি করে সরবরাহ করা হবে। কেউ অনিয়ম বা অপরাধে যুক্ত হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার নাম ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হবে। তরুণ ভোটারদের জন্য পৃথক বুথ ও সহায়ক ব্যবস্থা এবং নারী ভোটারদের জন্যও আলাদা বুথের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সহায়তার অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলায় মোবাইল কোর্ট টিম গঠন করা হবে। তারা ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং পরে সংঘটিত সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলায় মাঠে থাকবেন। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ১৫ দিন লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদের অস্ত্র বহন বা প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা থাকবে এবং সারা দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলবে।