ডেইলি প্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমূল পরিবর্তনের সময় দলটি আত্মপ্রকাশ করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজপথে কার্যকর উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের শক্তির জানান দেয় দলটি। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য সুস্পষ্ট— ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা।
দলটির নেতৃত্বে আছেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই এনসিপি এরইমধ্যে নিজেদের একটি সংগঠিত, নীতিনিষ্ঠ এবং পরিবর্তনমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
গঠনের প্রেক্ষাপট: অভ্যুত্থানের পর এক নতুন সূচনা
২০২৫ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার অভাব নতুন নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কাঠামোর চাহিদা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটেই এনসিপির জন্ম হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে দলটি মূলত ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠে। তাদের দাবি ছিল— গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, দুর্নীতির অবসান এবং জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া।
দর্শন ও রাজনৈতিক লক্ষ্য
এনসিপি নিজেদের নাগরিক-অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের ঘোষিত ২৪ দফা ইশতেহারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো:
দলটির মতে, বর্তমানে বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম হয়ে পড়েছে। তাই ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ ধারণার মাধ্যমে তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
রাজপথে আন্দোলন ও জনসম্পৃক্ততা
গঠনের পর থেকেই এনসিপি রাজপথে সক্রিয়। জুলাই মাসে দলটি ঢাকা, গোপালগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ৬৪ জেলায় পথসভা, পদযাত্রা, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশে অংশ নেন সব শ্রেণির সাধারণ মানুষ। তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এনসিপি।
সমালোচনা ও বিতর্ক
যে কোনো উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তির মতো এনসিপিকেও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেউ কেউ বলছে, তাদের প্রস্তাবিত নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, তারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআন্দোলনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করছে।
তবে এনসিপি নেতৃত্ব এসব সমালোচনাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বারবার বলেছেন,“আমরা পরিবর্তন চাই শান্তিপূর্ণ পথে, জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে। আমরা কাউকে বাদ দিতে চাই না, বরং সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।”
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এনসিপি এখনো নবীন। তবে তাদের সংগঠনগত শৃঙ্খলা, স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন, এবং ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি তাদের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এনসিপি গ্রামীণ পর্যায়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তরুণ ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে পারে এবং নিজেদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে পারে, তাহলে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে একটি প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি এখন পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের রাজনীতিতে প্রবেশের সময়কাল, স্পষ্ট লক্ষ্য ও সংগঠিত কর্মপদ্ধতি অনেকের কাছে আশাবাদের জন্ম দিয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়— প্রাতিষ্ঠানিক বাধা, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিক্রিয়া, এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চাপ তাদের মোকাবিলা করতে হবে।
তবুও, এনসিপি যদি তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিচল থাকে, তাহলে আগামী দিনের বাংলাদেশে তাদের অবস্থান হতে পারে ‘পরিবর্তনের প্রতীক’।