ডেইলি প্রেস ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ৩৭টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বই তৈরি করেনি, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ডাকসুর নেতারা সামনের সারিতে থেকেছেন। ডেইলি প্রেসের পাঠকদের জন্য ডাকসু নির্বাচনী ফলাফল ও প্রেক্ষাপটের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) নির্বাচিত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। এটি ছিল ডাকসুর ইতিহাসের সূচনা, তখনো কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়নি।
দ্বিতীয় ডাকসু নির্বাচনে আবারও ভিপি নির্বাচিত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। জিএস হন এ কে মুখার্জি। এসময় অস্থায়ীভাবে কিছুদিন জিএস পদে দায়িত্ব পালন করেন এ বি রুদ্র। সংগঠনের প্রভাব তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, মূলত ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও শিক্ষার্থীদের আস্থার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
এই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হন বি. কে. অধিকারী। ভিপি পদে কারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তার স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ সময় থেকে ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতির শেকড় বিস্তৃত হতে শুরু করে।
ভিপি পদে নির্বাচিত হন এ. এম. আজহারুল ইসলাম এবং জিএস হন এস. চক্রবর্তী। এ সময় ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে, যদিও এখনো ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন বা অন্য কোনো সংগঠন দৃশ্যমানভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
এই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন রমণী কান্ত ভট্টাচার্য। সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হন কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করে।
১৯৩২-৩৩ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ভবেশ চক্রবর্তী।
১৯৩৩-৩৪ শিক্ষাবর্ষেও ভবেশ চক্রবর্তী পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৩৫-৩৬ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এ. এইচ. এম. এ. কাদের।
১৯৩৬-৩৭ শিক্ষাবর্ষেও এ. এইচ. এম. এ. কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৩৮-৩৯ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আব্দুল আওয়াল খান।
১৯৪১-৪২ শিক্ষাবর্ষে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আব্দুর রহিম।
১৯৪৫-৪৬ শিক্ষাবর্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আহমদুল কবির। তবে কিছু সময় ফরিদ আহমেদ ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ সম্পাদক হন সুধীর দত্ত।
১৯৪৬-৪৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ফরিদ আহমেদ। সাধারণ সম্পাদক হন সুধীর দত্ত।
১৯৪৭-৪৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন অরবিন্দ বোস। আর জিএস হন গোলাম আযম।
১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন এস. এ. বারী। সাধারণ সম্পাদক হন জুলমত আলী খান। তবে কিছু সময় ফরিদ আহমেদ ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৪-৫৫ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন নিরোদ বিহারী নাগ। সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রব চৌধুরী।
১৯৫৫-৫৬ শিক্ষাবর্ষেও একইভাবে ভিপি হন নিরোদ বিহারী নাগ এবং সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রব চৌধুরী।
১৯৫৬-৫৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন একরামুল হক। সাধারণ সম্পাদক হন শাহ আলী হোসেন।
১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বদরুল আলম। আর সাধারণ সম্পাদক হন ফজলী হোসেন।
১৯৫৮-৫৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন আবুল হোসেন। জিএস হন এ. টি. এম. মেহেদী।
১৯৫৯-৬০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন আমিনুল ইসলাম তুলা। সাধারণ সম্পাদক হন আশরাফ উদ্দিন মকবুল। এ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে।
১৯৬০-৬১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন বেগম জাহানারা আক্তার। সাধারণ সম্পাদক হন অমূল্য কুমার।
১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন এস. এম. রফিকুল হক। সাধারণ সম্পাদক হন এনায়েতুর রহমান।
১৯৬২-৬৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন কে. এম. ওবায়দুর রহমান। এ সময় ছাত্রলীগের আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়।
১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়ন প্রভাব বিস্তার করে। ভিপি নির্বাচিত হন রাশেদ খান মেনন এবং সাধারণ সম্পাদক হন মতিয়া চৌধুরী।
১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বোরহানউদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক হন আসাফউদ্দৌলা। এ সময় ছাত্র ইউনিয়ন প্রভাবশালী থাকে।
১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী এবং জিএস হন শফি আহমেদ।
১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ছাত্র ইউনিয়নের মাহফুজা খানম । সাধারণ সম্পাদক হন একই সংগঠনের মোরশেদ আলী।
১৯৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রলীগ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ভিপি নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক হন নাজিম কামরান চৌধুরী।
১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের আ স ম আবদুর রব। জিএস হন একই সংগঠনের আব্দুল কুদ্দুস মাখন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের প্রভাব দেখা যায়। ভিপি নির্বাচিত হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক হন মাহবুব জামান।
১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষে দীর্ঘ বিরতির পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভিপি হন জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং সাধারণ সম্পাদক হন বাসদ ছাত্রলীগের আখতারুজ্জামান ।
১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষেও একইভাবে ভিপি হন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান।
১৯৮২-৮৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বাসদ ছাত্রলীগের আখতারুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক হন একই সংগঠনের জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু।
১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। সাধারণ সম্পাদক হন মুশতাক হোসেন।
১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন। পরবর্তী সময়ে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভিপি নির্বাচিত হন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর। অন্যদকে সাধারণ সম্পাদক হন ছাত্রলীগের গোলাম রব্বানী। যদিও ওই নির্বাচনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনা হয়। এতে সহায়তা করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ছাত্রীদের হলগুলোতে ব্যাপক প্রতিরোধের কারণে নুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন বলে মত সংশ্লিষ্টদের।