ডেইলি প্রেস ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, সংক্ষেপে ডাকসু, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৩ সালে নাম পরিবর্তন করে বর্তমান রূপ লাভ করে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন— প্রতিটি সংগ্রামে ডাকসু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এজন্য একে বাংলাদেশের “দ্বিতীয় সংসদ” হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
১৯২২ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন হলে শিক্ষকদের সভায় ডাকসু গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ১৯২৪-২৫ সেশনে প্রথম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। এরপর ক্রমান্বয়ে আবির্ভূত হন একাধিক সাহসী ছাত্রনেতা, যারা জাতীয় রাজনীতিতেও অবদান রেখেছেন। ১৯৫৩ সালে নাম পরিবর্তনের পর ডাকসু নতুন ধারায় কার্যক্রম শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস হন মাহবুব জামান। ১৯৯০-৯১ সেশনে ভিপি হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও জিএস হন খায়রুল কবির খোকন। এরপর দীর্ঘ সময় ডাকসুর নির্বাচন স্থগিত থাকে।
ডাকসুর ইতিহাসে বহু আন্দোলনের স্মরণীয় অধ্যায় রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু নেতারা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন ছিল ডাকসুর এক অনন্য অর্জন।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক অনীহা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় নির্বাচন বন্ধ ছিল। ১৯৯০ সালের পর টানা ২৮ বছর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অবশেষে ২০১৯ সালে আলোচিত নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুর এবং জিএস হন ছাত্রলীগের গোলাম রব্বানী।
ডাকসুর নেতৃত্বে ইতিহাসের আলোচ্য ব্যক্তিত্বদের তালিকা দীর্ঘ। ১৯৬৩-৬৪ সেশনে ছাত্র ইউনিয়নের রাশেদ খান মেনন ভিপি এবং মতিয়া চৌধুরী জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ সেশনে ছাত্রলীগের তোফায়েল আহমেদ ভিপি ও নাজিম কামরান চৌধুরী জিএস হন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ১৯৭০-৭১ সেশনে ছাত্রলীগের আ স ম আবদুর রব ভিপি এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন জিএস নির্বাচিত হয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেন। ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১ সেশনে জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না ভিপি নির্বাচিত হন, আর বাসদ ছাত্রলীগের আখতারুজ্জামান জিএস হন।
অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের মতে, ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্তানতন্ত্র বিস্তার লাভ করে এবং গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। তবুও ডাকসুর ঐতিহ্য এবং গৌরব আজও বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির অনন্য প্রতীক।
প্রায় একশ বছরের এই যাত্রায় ডাকসু কেবল একটি ছাত্রসংসদ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আজও তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছে ডাকসু।