ডেইলি প্রেস ডেস্ক: থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার সীমান্তে চলমান সংঘর্ষ তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) উভয় দেশই একে অপরকে সংঘর্ষ শুরুর জন্য দোষারোপ করলেও দুপক্ষই দাবি করেছে, তারা কেবল আত্মরক্ষার্থেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং উভয়পক্ষই সংঘর্ষ বন্ধ করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে।
এই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে গত ১৩ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা। এতে ৩০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
শনিবার ভোরে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয় বলে জানায় উভয়পক্ষ। নতুন করে সংঘর্ষ দেখা দেয় থাইল্যান্ডের তটবর্তী প্রদেশ ত্রাত এবং কাম্বোডিয়ার পুরসাত প্রদেশে—যা আগে সংঘর্ষ চলা স্থানগুলো থেকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে। মে মাসের শেষ দিকে এক কাম্বোডিয়ান সৈন্য নিহত হওয়ার পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা চরমে ওঠে। দুই দেশের সীমান্তে সৈন্য বাড়ানো হয় এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে থাইল্যান্ডের জোট সরকার ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়।
থাইল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত সংঘর্ষে দেশটির সাতজন সৈন্য এবং ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, কাম্বোডিয়া জানিয়েছে, তাদের পাঁচ সৈন্য ও আট বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব তথ্য জানিয়েছেন কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মালি সোচেতা।
থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী সিসাকেত প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে এক স্বেচ্ছাসেবক জানিয়েছেন, বর্তমানে সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছেন। সামরং খামদুয়াং নামে এক নারী জানান, সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে তার খামার বাড়ি থেকে তিনি পালিয়ে এসেছেন। তবে তার স্বামী পশুপালনের জন্য বাড়িতে থেকে গেছেন। তিনি বলেন, “গোলাবারুদের শব্দে আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বামী বাড়িতেই রয়ে গেছে, আর এখন তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আমি জানি না সে কেমন আছে।”
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং আসিয়ান (ASEAN) জোটের চেয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, তিনি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কাম্বোডিয়া আনোয়ারের প্রস্তাবকে সমর্থন দিলেও থাইল্যান্ড কেবল ‘নীতিগতভাবে একমত’ বলে জানিয়েছে।
আনোয়ার বলেন, “এখনো কিছু গোলাগুলি চলছে।” তিনি জানান, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে এবং সম্ভব হলে তিনি নিজেই আলোচনায় এগিয়ে আসবেন—কমপক্ষে সংঘর্ষ থামানোর লক্ষ্যে।
শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত চের্দচাই চাইভাইবিড জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে থাই ভূখণ্ডে নতুন করে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে দুইবার সৈন্য আহত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এরপর কাম্বোডিয়া বৃহস্পতিবার সকালেই পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, “থাইল্যান্ড কাম্বোডিয়াকে অবিলম্বে সকল ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে এবং আন্তরিকভাবে সংলাপে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।”
অন্যদিকে, কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “থাইল্যান্ড একটি পরিকল্পিত, উসকানিমূলক এবং অবৈধ সামরিক হামলা চালিয়েছে” এবং সীমান্তে সেনা ও অস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে তারা সংঘাত বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ভাষায়, “এই পরিকল্পিত মোতায়েন প্রমাণ করে যে থাইল্যান্ড আরও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কাম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের চেষ্টা করছে।” কাম্বোডিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা “থাইল্যান্ডের আগ্রাসনকে তীব্রভাবে নিন্দা জানায়” এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা থামানোর ব্যবস্থা নেয়। তবে থাইল্যান্ড জানিয়েছে, তারা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে চায়।
৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বহু বিনির্ধারিত অঞ্চল নিয়ে থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। বিশেষ করে প্রাচীন হিন্দু মন্দির তা মোয়ান থম এবং একাদশ শতাব্দীর প্রোহ ভিহার মন্দির এ বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক আদালত প্রোহ ভিহার মন্দিরকে কাম্বোডিয়ার অংশ বলে রায় দেয়। তবে ২০০৮ সালে মন্দিরটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে চাওয়ায় উত্তেজনা আবার বাড়ে এবং দুই দেশের মধ্যে কয়েক বছর ধরে ছড়ানো সংঘর্ষে এক ডজনের বেশি প্রাণহানি ঘটে।
কাম্বোডিয়া সম্প্রতি আবারও আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি নিয়ে গিয়েছে। তবে থাইল্যান্ড জানিয়েছে, তারা আদালতের এখতিয়ারকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকেই সেরা উপায় মনে করে।